প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১২:২১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

# তদন্তের নির্দেশ দিয়ে ১৫ কর্মদিবসের সময় বেঁধে দিয়েছিল মন্ত্রণালয়, প্রায় মাস পেরোলেও আলোর মুখ দেখেনি # নতুন কমিটি; নেপথ্যে কি অদৃশ্য টাকার খেলা?

গণপূর্তের ‘আলাদিনের চেরাগ’ তাজুল: তদন্ত কমিটি নিয়েও ইঁদুর-বেড়াল খেলা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি সম্পত্তি দখল, কোটি কোটি টাকার ভাড়া বাণিজ্য, প্রকাশ্য চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেট দাপটে গণপূর্তের অঘোষিত সম্রাট বনে গেছেন ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের উচ্চমান সহকারী মোঃ তাজুল ইসলাম। তার দুর্নীতির খতিয়ান এতটাই দীর্ঘ যে, স্বয়ং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে কড়া তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে ফাইলবন্দি হয়ে আছে পুরো প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয় থেকে মাত্র ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আলটিমেটাম দেওয়া হলেও, গণপূর্ত অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তার রহস্যজনক ‘ধীরগতি’ ও ‘কমিটি বাতিল-গঠনের খেলা’ অধিদপ্তরে তীব্র ক্ষোভ ও নানামুখী গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও উপেক্ষিত!
অনুসন্ধানে জানা যায়, গণপূর্তের এই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা ফুঁসে ওঠেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর মোঃ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সরকারি আবাসন ও ভাড়া বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং রাজস্ব ক্ষতির তদন্ত চেয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ একটি লিখিত আবেদন দাখিল করা হয়।
আবেদনের গুরুত্ব বিবেচনা করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখা-৮ থেকে গত ১৮ মে ২০২৬ তারিখে (স্মারক নম্বর: ২৫.০০.০০০০.০১৪.৯৯.০০৬.১৯-৩১৪) একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। উপ-সচিব মোছাঃ লুৎফুন নাহার নাজিম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে আগামী ১৫ (পনেরো) কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য ‘নির্দেশক্রমে অনুরোধ’ করা হয়।

তদন্ত কমিটি নিয়ে নাটক: ‘কাজের চাপ’ নাকি টাকার দাপট?
মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া ১৫ কর্মদিবসের সময়সীমা প্রায় শেষ প্রান্তে। ১০ জুন পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তর কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানতে অধিদপ্তরে সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চরম নাটকীয়তা। সংস্থাপন শাখার কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায় প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান প্রতিবেদককে জানান, তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়েছে! বর্তমানে নতুন আরেকটি কমিটি প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদনের অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর গঠিত কমিটি কেন বাতিল হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যাকে কমিটির প্রধান করা হয়েছিল, তিনি অত্যাধিক কাজের চাপের কারণে দায়িত্ব পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করায় কমিটি বাতিল হয়েছে।’ তবে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি ভিন্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কাজের চাপ উসিলা মাত্র। মূলত তাজুলের কালো টাকার পাহাড়ের কাছে নতিস্বীকার করেই এই কমিটি ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে। তদন্তের গতি ধীর করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।”

অতীতের তদন্ত রিপোর্টও হাপিশ!
গণপূর্তের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, তাজুল ইসলামের খুঁটির জোর এতটাই গভীরে যে, অতীতেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ইতিপূর্বেও তাজুলের নানাবিধ দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি তাজুল ইসলামের দুর্নীতির সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ রিপোর্ট প্রদান করলেও অদৃশ্য জাদুবলে সেই রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়া হয়। কোনো এক অলৌকিক ক্ষমতায় তাজুল আজ অব্দি বহাল তবিয়তে তার অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

লুটপাটের খতিয়ান: যেখানে হাত, সেখানেই টাকাঃ
অভিযোগের খতিয়ান থেকে জানা যায়, সাবেক কেন্দ্রীয় সচিবালয় (এনএসআই) ভবন সংলগ্ন এলাকার ৫১টি সরকারি ঘর অবৈধভাবে দখল করে প্রতি মাসে প্রায় ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) টাকা ভাড়া বাণিজ্য করে যাচ্ছেন তাজুল। প্রথম কোর্ট অব সেটেলমেন্ট এলাকায় আদালতের গাড়িচালকদের জন্য নির্ধারিত দুটি কক্ষ দখল করে ব্যাহত করছেন বিচারিক কাজ। ২০১১ সাল থেকে ১ম ১২ তলা ভবনের পূর্ব পাশের একটি টিনশেড অবৈধভাবে দখল করে রাখায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ সরকারের ক্ষতি হয়েছে ২২,৬২,০০০ টাকা। এছাড়া পূর্ত ভবনের ক্যান্টিন বরাদ্দ দিয়ে এককালীন ৫,০০,০০০ টাকা এবং মাসিক ৩৫,০০০০০ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই চাঁদাবাজির টাকায় রাজধানীর নন্দিপাড়ায় ১০ কাঠা জমির ওপর তার বহুতল ভবন নির্মাণের কাজও চলছে দাপটের সাথে।


ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারী, নজর এখন প্রধান প্রকৌশলীর দিকেঃ
গণপূর্ত অধিদপ্তরে এখন একটাই গুঞ্জন—তাজুলের ক্ষমতা ও টাকার কাছে কি তবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনও জিম্মি? সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং এবার মন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশের পরও তদন্ত কমিটি বাতিলের ঘটনা তাজুলের সেই ‘সব ম্যানেজ’ করে নেওয়ার গুঞ্জনকেই সত্যি প্রমাণ করছে।
সচেতন মহল ও সাধারণ কর্মচারীদের প্রশ্ন, প্রধান প্রকৌশলী কি পারবেন এই চক্রের জাল ছিন্ন করে তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে? নাকি এবারও গণপূর্তের এই ‘আলাদিনের চেরাগ’ নিয়ন্ত্রণকারী কর্মচারীর ফাইলটি ধামাচাপা পড়ে থাকবে? গণপূর্তের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধারে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন