প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
পলাশ চন্দ্র দাস, স্টাফ রিপোর্টার
স্বাস্থ্য কেবল একটি চিকিৎসা বিষয়ক ইস্যু নয়। এটি মানবাধিকার, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, সামাজিক সংহতি এবং টেকসই উন্নয়নের একটি মৌলিক পূর্বশর্ত বলে বক্তারা দাবি জানান।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি শফিকুল কবির মিলনায়তনে (৭ জুন ২০২৬) রবিবার বিকাল ৩ টায় "বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রান্তির নাগরিক অধিকার ও কাঠামোগত সংস্কার" শীর্ষক জাতীয় পরামর্শসভায় ইনভেশন ফর ওয়েবিং ফাউন্ডেশন ও হিরোস ফর অল কর্তৃক উত্থাপিত সুপারিশ সমূহ আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সরকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন - আমাদের স্কুল গুলোতে নৈতিক শিক্ষা নেই, পারিবারিক যে শিক্ষা সেই শিক্ষায় শিক্ষিত করে তৈরি করতে পারিনা, বাচ্চাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে পারিনা, আমরা চাই বাচ্চারা যাতে আনন্দের সাথে ইস্কুলে যায় সেই ব্যবস্থা করতে,আমরা চাই মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে, এই জন্য সরকার তৎপর।
বক্তারা বক্তারা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য কেবল একটি চিকিৎসা বিষয়ক ইস্যু নয়। এটি মানবাধিকার, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, সামাজিক সংহতি এবং টেকসই উন্নয়নের একটি মৌলিক পূর্বশর্ত। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত একাধিক ঘটনা আমাদের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। দুলালির মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতালভিত্তিক রেফারেল ব্যবস্থা, পরিচয়পত্রবিহীন ও ভাসমান ব্যক্তির চিকিৎসা অধিকার, এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ঘাটতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
অনুষ্ঠানটিতে, ইনোভেশন ফর ওয়েল্ডিং ফাউন্ডেশন এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, মনিরা রহমান বলেন,বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে অন্তত ১৪,৪৩৬টি আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশেও আত্মহত্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক সুস্থতার অবনতি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানটিতে মঞ্চে উপস্থিত বক্তারা আরো বলেন , একজন পুলিশ সদস্য বা ব্যাংক কর্মকর্তাসহ একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান মানসিক চাপ, ট্রমা ও বার্নআউটের মত গভীর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটকে সামনে এনেছে। তেমনই নিজ বাসভবনে প্রবীণ মায়ের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আমাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব এবং প্রবীণদের জন্য দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা এবং মব সহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি আমাদের সামাজিক সুস্থতা, মানসিক নিরাপত্তা এবং প্রতিরোধমূলক সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। আমরা বিশ্বাস করি, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এগুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ, স্থানীয় সরকার, শ্রম, আইন-শৃঙ্খলা, সামাজিক সুরক্ষা ও কমিউনিটি ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ সময় ধরে, একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনা/ দুর্ঘটনা সাধারন জনগনের মনে অনিরাপত্তা, ভীতি, অস্বস্তি থেকে শুরু করে গভীর ট্রমা তৈরি করছে যা এখনি সারিয়ে তোলার উদ্যোগ না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া আমাদের সমাজে পারিবারিক ও সোশ্যাল হারমনি, শান্তি, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন যত্নশীল সমাজ গঠনে গভীর সঙ্কট তৈরি করবে যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থ্যতা সূচকে প্রতিফলিত হতে বাধ্য।
নীতিগত অবস্থান:
ক. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার,
খ. মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুস্থতা (Wellbeing) অবিচ্ছেদ্যভাবে পরস্পর সম্পর্কিত,
গ. কোনো ব্যক্তি দারিদ্র্যতা, বয়স, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধকতা, ভৌগোলিক অবস্থান, গৃহহীনতা, গোষ্ঠী বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না,
ঘ. কোনো নাগরিক চিকিৎসা, আশ্রয়, পুনর্বাসন অথবা সামাজিক সুরক্ষার অভাবে রাস্তায় জীবনযাপন করতে বা মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হতে পারেন না,
ড. মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়, বরং একটি সমগ্র-সরকারি ও সমগ্র-সমাজভিত্তিক এজেন্ডা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সরকারের নিকট প্রস্তাবনা গুলো হল :
১. মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কে জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করতে;
২. মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮-এর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে;
৩। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা (২০২০-২০৩০)-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে;
৪। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি স্বতন্ত্র মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ গঠন করতে হবে;
৫। সংশ্লিষ্ট সরকারী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ, সমাজকর্মী, লিভড এক্সপেরিয়েন্স সম্পন্ন প্রতিনিধি ব্যক্তি'র সমন্বয়ে 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা সমন্বয় কাউন্সিল' গঠন করতে;
৬. বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি করে অন্তত ১.৫%-এ উন্নীত করার এবং এই বরাদ্দের সিংহভাগ প্রতিরোধমূলক, কমিউনিটিভিত্তিক মনো-সামাজিক সেবা, স্কুল মেন্টাল হেলথ প্রমোশন এবং গবেষণা মূলক কাজে ব্যয় করতে;
৭. ভাসমান, গৃহহীন, পরিচয়পত্রহীন ব্যক্তিদের জন্য "আগে চিকিৎসা, পরে পরিচয়" নীতিমালা জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে;
৮। প্রতিটি বিশেষায়িত ও তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে (Tertiary level Hospital) চিকিৎসকের পাশাপাশি, পেশেন্ট রেশিও হিসাবে নার্স, কাউন্সেলর, মানসিক স্বাস্থ্য সমাজকর্মী নিয়োগ দিতে;
৯। একই ভাবে পর্যায়ক্রমে, জেলা হাসপাতালে কম্প্রহেন্সিভ বা সমন্বিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে;
১০। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেসিক মানসিক স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ বাস্তবায়নে করতে;
১১। সকল কমিউনিটি ক্লিনিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল, কর্মক্ষেত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস বা জরুরী সেবা প্রদানকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রাথমিক চিকিৎসা বা Trauma-informed Approach এ প্রশিক্ষন থাকা বাধ্যতামূলক করতে;
১২। জাতীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য স্বাক্ষরতা অভিযান চালাতে এবং এর জন্য গনমাধ্যম কর্মীদেরকে প্রশিক্ষন দিতে;
১৩। গন মাধমে প্রচলিত জনপ্রিয় ফোক আর্ট ফর্ম যেমন মিনা কার্টুন বা সিসেমি স্ট্রিট প্রোগ্রাম এর মত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচী মাধ্যমে গন মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করতে;
১১. নেচার থেরাপি বা প্রাকৃতিক পরিবেশে সুস্থ্য হয়ে ওঠার জন্য নগর বনায়ন করতে; পার্ক দখল মুক্ত করে জনগনের হাটা, খেলাধুলা ও নিরাপদে বিশ্রাম নেওয়ার মত পরিবেশ তৈরি করতে;
১২। মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েদ্বিং ইকো সিস্টেম গড়ে তুলতে, সকল সেক্টরে ওয়েল্কিং কে প্রাধান্য দিতে, এবং যুবশক্তিকে ওয়েখ্রলবিয়িং প্রতিষ্ঠার কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে।
উক্ত, আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মনিরা রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডঃ এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সিলিং সাইকোলজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ডঃ মেহজাবিন হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট এর শিক্ষক প্রফেসর ডঃ সৈয়দ আব্দুল হামিদ, ডাঃ নুর আহমেদ গিয়াসউদ্দিন, ডঃ ইশকুল কবির, অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী,এডভোকেট খন্দকার শাহরিয়ার শাকিল,মুছা করিম রিপন প্রমূখ।
মন্তব্য করুন